দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের সেই দিনটির দুই বছর পূর্ণ হলো আজ।
বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। তবে দুই বছর পর ফিরে তাকালে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, তৃণমূলের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে যেমন উঠে এসেছে বড় অর্জনের কথা, তেমনি উঠে এসেছে অপূর্ণতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার বিষয়টিও।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে (কেআইবি) আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, দেশে জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সফলতার কৃতিত্ব দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব নয়।
তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছর বিএনপি আন্দোলনে মাঠে ছিল। কিন্তু আন্দোলন তখনই সফল হয়েছে, যখন দেশের সর্বস্তরের জনগণ এতে সম্পৃক্ত হয়েছে।
দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এখন সময় দেশ পুনর্গঠনের। জনগণ চায় আমরা আমাদের বলা কথাগুলো বাস্তবায়ন করি। আমাদের ৩১ দফার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।’
অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে অর্জন ও অপূর্ণতা নিয়ে জাগো নিউজ কথা বলেছে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, তৃণমূলের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের সঙ্গে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য
অভ্যুত্থানের দুই বছর পর মূল্যায়ন জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, এ বিষয়ে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলোচনা সভায় বক্তব্য দিয়েছেন। সেটিই তাদের বক্তব্য।
শামসুজ্জামান দুদু, ভাইস-চেয়ারম্যান বিএনপি
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সরকারের পতন এবং গণতন্ত্রে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া। তার ভাষায়, গণতন্ত্রের পথে দেশের যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। দেশবাসী নির্বাচিত সরকার ও নির্বাচিত সংসদ পেয়েছে। তবে অপূর্ণতা এখনো অনেক রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে পূরণ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এক বা দেড় বছরে পূরণ হওয়ার বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হবে।
রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব
তার মতে, এরই মধ্যে অনেক কিছুই পূরণ হয়েছে। দেশ যদি ভালোভাবে পরিচালিত হয়, গণতন্ত্র যদি স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে আরও অনেক আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হবে।
তিনি বলেন, দেশে যদি সঠিক উন্নয়ন হয়, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে লুটপাট না হয়, তাহলে বলা যায় দেশ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা নাজিম উদ্দিন আলম বলেন, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের অর্জনের মধ্যে রয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন, নির্বাচিত সরকার গঠন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন।
তার মতে, গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহিতা থাকে এবং গণতন্ত্র সহনশীলতার কথা বলে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা নাজিম উদ্দিন আলম
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহনশীল আচরণ করছেন এবং বিএনপি নেতাদেরও তাকে অনুসরণ করা উচিৎ। ফ্যাসিস্টের মতো আচরণ করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দলও ফ্যাসিস্ট হয়ে পালিয়ে গেছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা-বিভক্তি তৈরি হয়েছে, সেটি হতাশার বিষয়।
বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাৎ হোসেন সেলিম
তৃণমূলের মূল্যায়ন
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুর আলম খান হিরো বলেন, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দেশের মানুষের মধ্যে অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা।
তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছে, জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
তবে তিনি বলেন, এই অর্জনকে পূর্ণতা দিতে এখনো অনেক কাজ বাকি। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও অনেক দূর যেতে হবে
তার মতে, যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
ইতিহাসে ৫ আগস্টের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে নুর আলম খান হিরো বলেন, ভবিষ্যতে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণজাগরণের দিন হিসেবে মূল্যায়িত হবে। এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং জনগণের অধিকার, মর্যাদা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার শক্তিশালী প্রকাশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে ৫ আগস্টকে জনগণের ঐক্য ও সাহসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখবে।
নুর আলম খান হিরো, যুগ্ম আহ্বায়ক, রৌমারী উপজেলা বিএনপি
তিনি আরও বলেন, এই দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো ক্ষমতাই জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হতে হবে জনগণের কল্যাণ, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শুধু আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা যথেষ্ট নয়; সেই পরিবর্তনকে টেকসই করতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তার মতে, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠলেই ৫ আগস্টের চেতনা পূর্ণতা পাবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির মূল্যায়ন
গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির দিকেও নজর দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কখনোই বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে না, কারণ এতে নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তার ভাষায়, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্ভাব্য অনেক বিনিয়োগ বাতিল হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দরে দুবাইয়ের সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনো রয়েছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে টুটুল বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতিও গতি ফিরে পাবে।
তার মতে, ৫ আগস্টের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—সবাইকে কোনো না কোনো সময় জবাবদিহির আওতায় আসতেই হবে—এমন একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সুশাসনের পূর্বশর্ত।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন?
দুই বছর পর ফিরে তাকালে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ধারায় কী ধরনের স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, রাজনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তন বলে কিছু নেই; রাজনীতি সব সময়ই পরিবর্তনশীল।
তার ভাষায়, সংবিধানও সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন হয়েছে। এরপর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।
তার মতে, গণতন্ত্র কিছুটা হলেও মুক্তি পেয়েছে এবং মানুষ আগের মতো কথা বলতে ভয় পায় না।

মহিউদ্দিন খান মোহন, রাজনীতি বিশ্লেষক, ছবি: ফেসবুক
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি চলছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুষের কারবার অব্যাহত রয়েছে এবং রাস্তায় চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে।
মহিউদ্দিন খান মোহনের মতে, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের অবসান ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেই সময়কার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও স্বীকার করেছেন যে চার-পাঁচ মাসে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ৫ আগস্টের আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য ছিল, তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেএইচ/এমআইএইচএস/




