বিপ্লবের দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসেনি

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, পাঁচ আগস্ট আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। বাংলা বদ্বীপের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, গৌরব ও বিজয়ের ধারাবাহিকতার প্রতীক।

বুধবার (৫ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এ কথা বলেন তিনি।

নাহিদ বলেন, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ঔপনিবেশিক বেনিয়া শাসনের সূচনার পর থেকেই এই ভূখণ্ডের মানুষ মুক্তির প্রত্যয়ে জেগে ওঠে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজি শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, হাবিলদার রজব আলীর বিদ্রোহ এবং শেরে বাংলার লাহোর প্রস্তাব সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও অবিরাম প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে জাতি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ভূখণ্ডের অধিকার অর্জন করে।

তিনি বলেন, কিন্তু সেই আজাদীর আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর বাংলার জনগণ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ ২৪ বছরের বৈষম্য, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই শেষে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আমাদের লাল সবুজের পতাকা। লাখো শহীদের আত্মদান, অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও জনগণের প্রত্যাশিত ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে বহু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।

নাহিদ বলেন, এরপর দফায় দফায় এ দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নেমে এসেছে, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে এক এগারোর কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথাকথিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ১৮ কোটি মানুষের কাঁধে চেপে বসে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদ। মুক্তিযুদ্ধের নামে মুজিববাদী আদর্শের ভিত্তিতে আওয়ামী জুলুমতন্ত্রের কবলে পড়ে দেশ। বাকশালী শক্তির হাতে ধ্বংস হয় এ দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, সমাজ ও সংস্কৃতি। আধিপত্যবাদী শক্তির ইশারায় বারবার এ ভূখণ্ডের মানুষের জীবনে নেমে আসে বর্বর দমন-পীড়ন।

আরও পড়ুন

পাঁচ আগস্টের দুই বছর: অর্জনের স্বীকৃতি, অপূর্ণতার প্রশ্ন

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতায় ছাত্রদের ন্যায্য কোটা সংস্কার আন্দোলনেও হাসিনার লাঠিয়াল বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই রক্তস্নাত অধ্যায় থেকেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, আলেম-ওলামা, আইনজীবী, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, প্রবাসী, সৈনিক, তরুণ সেনা অফিসার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত সংগ্রামে পতন ঘটে বাকশালী অপশক্তির। চৌদ্দ শত শহীদ এবং ৩০ হাজার আহতের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে আসে ৫ আগস্টের মাহেন্দ্রক্ষণ, বহুল প্রতীক্ষিত মুক্তির প্রভাত।

তিনি বলেন, দুঃখজনক হচ্ছে, ৫ আগস্টের সেই বিজয়লগ্ন থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রবল অসহযোগিতার কারণে শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ পায়নি। ক্ষমতালিপ্সার কাছে পরাজিত হয়েছে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলোপের গণআকাঙ্ক্ষা।

তিনি আরও বলেন, বিপ্লবের দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসেনি। সরকারের নজিরবিহীন দলীয়করণ, সংস্কারবিরোধী অবস্থান, ক্ষমতার অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা জাতিকে আবারও সংকটের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।

নাহিদ বলেন, বিজয়ের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে সরকারের প্রতি আমাদের আন্তরিক আহ্বান, গণভোটে প্রদত্ত জনরায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে সংস্কার বাস্তবায়ন করুন। সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি পরিহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করুন। চব্বিশসহ সব গণহত্যার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করুন।

তিনি বলেন, শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ মুগ্ধ, শহীদ হৃদয় তরুয়াসহ সব শহীদের রেখে যাওয়া আমানত আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। আসুন, তার মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় কণ্ঠে সোচ্চার হই। ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার মহান সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে শামিল হই।

এনএস/এমআইএইচএস/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *